
কক্সবাংলা ডটকম(১৫ আগস্ট) :: পাল্টাচ্ছে বর্ষাকালের সময়। বদলাচ্ছে আবহাওয়া। বঙ্গোপসাগরে ধীরে ধীরে শেষ হতে চলেছে মাছ! এক সমীক্ষায় উঠে এল চাঞ্চল্যকর তথ্য। ইলিশ বা আপনার পছন্দের মাছ আগামীদিনে খেতে পারবেন তো? সে নিয়েই বাড়ছে অনিশ্চয়তা।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সাগরে ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যান্য বছর এ সময়ে যে পরিমাণ ইলিশ পাওয়া যেত এবার তা পাওয়া যাচ্ছে না বঙ্গোপসাগরে। ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা খরচ করে বোট মাছ ছাড়া ফিরে আসছে উপকূলে। এর প্রভাব পড়ছে স্থানীয় বাজারে। ফলে ইলিশের বাজার গরম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন,অনাবৃষ্টি, সমুদ্রে জলোচ্ছ্বাস। উত্তর ও পূর্ব দিকমুখী বায়ু। এ বায়ু প্রবাহিত হলে মাছ গভীর সমুদ্রে চলে যায়। সাধারণত দক্ষিণ থেকে উত্তরমুখী বায়ু খুবই উপযোগী মাছের জন্য। তখন এটাকে সমুদ্রের মাছের বসন্তকাল ভাবা হয়। কিন্তু বায়ুর দিক পরিবর্তন হয়ে গেলে তখন আর মাছ পাওয়া যায় না। মাছ গভীর সমুদ্রের দিকে চলে যায়।
এর কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে কি না আমার জানা নেই। কিন্তু এটিই বাস্তবতা। জলোচ্ছ্বাসের সময় সমুদ্রে সংকেত থাকে। তখন মাছ ধরার বোট উপকূলে চলে আসতে হয়। সে সময় মাছ ধরা যায় না। দেশে এখন ঘন ঘন জলোচ্ছ্বাস হচ্ছে। এতে মাছ আরও ওপরের দিকে বা ভারতীয় উপকূলের দিকে চলে যায়। বিশেষ করে ইলিশ মাছ তখন কলকাতার দিকে চলে যায়।
নেচার জিওসায়েন্সে প্রকাশিত সাম্প্রতিক একটি গবেষণা বলছে, বিশ্বে যেভাবে জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে, তাতে এরাজ্যে গরম কাল ও বর্ষাকাল বিপর্যস্ত হতে চলেছে। ঠিক এর ফলেই হুমকির মুখে জলজ বিভিন্ন প্রাণি। যাতে মাছও রয়েছে।
গবেষকরা গত ২২ হাজার বছরের মৌসুমি এবং মহাসাগর সম্পর্কিত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, অতিবৃষ্টি বা খরার সময় বঙ্গোপসাগরের উপরিভাগে খাদ্য সরবরাহ প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। এই প্রবণতা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে আরও ঘন ঘন দেখা দিতে পারে আশঙ্কা করেন তাঁরা।
গবেষণা বলছে, বিশ্বে যতভাগ জল আছে, তার ১ শতাংশেরও কম অংশজুড়ে রয়েছে বঙ্গোপসাগর কিন্তু এটি বিশ্বের আট শতাংশ মাছের উৎস। ইলিশের মতো সুস্বাদু মাছও এই সাগরেই জন্মায়।
বিজ্ঞানীরা ফরামিনিফেরা নামের এক ধরণের অণুজীব প্ল্যাঙ্কটনের জীবাশ্ম খোলস জোগার করেন। এই খোলসগুলিতে প্রাচীন পরিবেশগত পরিস্থিতির রেকর্ড থাকে। এভাবে তাঁরা ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে মৌসুমি বৃষ্টিপাত, বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক উৎপাদনে কী প্রভাব ফেলেছে, তা পরীক্ষা করে দেখেন। সেখান থেকে পাওয়া তথ্য উল্লেখ করেন গবেষণাপত্রে।
দেখা যায়, অতিরিক্ত কম অথবা অত্যন্ত বেশি মৌসুমি বৃষ্টিপাত, উভয়ই সমুদ্রের জলের স্তরকে মিশতে বাধা দেয়, ফলে গভীর জল থেকে উপরের স্তরে পুষ্টি সরবরাহ হয় না। এতে প্ল্যাঙ্কটনের বৃদ্ধিতে ব্যাঘাত ঘটে এবং সামুদ্রিক খাদ্য চক্র বিপর্যস্ত হয়।
উদাহরণ হিসেবে গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৭ হাজার ৫০০ থেকে ১৫ হাজার ৫০০ বছর আগে হাইনরিখ স্টাডিয়াল ১ (Heinrich Stadial 1)-এর সময়কালে মৌসুমি বাতাসের শক্তি কম থাকায় পুষ্টি উপাদান উপরে ওঠেনি। অপরদিকে, প্রায় ১০ হাজার ৫০০ থেকে ৯ হাজার ৫০০ বছর আগে প্রাক-হোলোসিন কালে অতিবৃষ্টির ফলেও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়। এই দুই ক্ষেত্রেই সামুদ্রিক উৎপাদন একেবারে ভেঙে পড়ে। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, এমন ঘটনা আগামিদিনে আবারও হতে পারে।
প্রায় ১৫ কোটি মানুষ বঙ্গোপসাগরের মাছের উপর নির্ভরশীল। গবেষণার এক লেখক এবং জলবায়ু বিজ্ঞানী ইয়ায়ার রোসেনথাল বলেন, ‘সমুদ্রের প্ল্যাঙ্কটন উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস পেলে, সামগ্রিক মাছের মজুদ কমবে।’ অবস্থা আরও জটিল হতে পারে বাংলাদেশ-সহ উপকূলবর্তী অঞ্চলের কারিগরি মৎস্যশিল্প, যা এই অঞ্চলের মোট সামুদ্রিক মাছের ৮০ শতাংশের জোগান দেয়।
সাগর-মহাসাগর সংক্রান্ত আধুনিক কিছু তথ্য ও জলবায়ু মডেলও এই বিপর্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। গবেষণার আসল লেখক কৌস্তভ থিরুমালাইয়ের মতে, ইলিশ মাছের সংখ্যা বারবার এই বিপর্যয়ের ফলে তলানিতে চলে যেতে পারে, এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট একটি এলাকার মানুষজন অপুষ্টিতে পর্যন্ত ভুগতে পারেন।
আর যাই হোক, গবেষণার ফলে অন্তত এটা পরিষ্কার হয়েছে, জলবায়ু সংক্রান্ত মডেল আরও উন্নত করা এবং টেকসই কোনও নীতি কার্যকর করা এখন অত্যন্ত জরুরি। ইয়ায়ার রোসেনথাল বলেন, ‘এই তথ্যগুলিকে কাজে লাগিয়ে উপকূলীয় সম্পদ রক্ষা করার পরিকল্পনা তৈরি করা উচিত, কারণ জলবায়ুর দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে।’

বিশেষজ্ঞরা জানান, নোনা জলের ইলিশ ডিম পাড়তে নদীর উজান ঠেলে মিঠা পানিতে উঠে আসে। ডিম ছেড়ে আবার ভাটিতে গা ভাসিয়ে ধরে সাগরের পথ। এর জন্য প্রয়োজন হয় পর্যাপ্ত পানিপ্রবাহের। বর্ষা মৌসুমে অর্থাৎ জুলাই থেকে অক্টোবরে মেঘনা নদীর নিম্নাঞ্চলের পানি স্বচ্ছ হয়ে ওঠে এবং লবণাক্ততা থাকে না।
আবার প্রবল স্রোত ও জোয়ার-ভাটার কারণে ইলিশ সমুদ্র থেকে নদীতে আসতে শুরু করে। পাশাপাশি ইলিশের ডিম ছাড়ার সময় প্রচুর অক্সিজেন প্রয়োজন হয়। বর্ষায় নদীর পানি তুলনামূলক উত্তাল থাকে বেশি। এ সময় পানিতে অক্সিজেনের মাত্রাও বেশি থাকে।
এছাড়া মাছের বংশবিস্তারে পানির তাপমাত্রা একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। এর ওপর নির্ভর করে মাছের ডিম ছাড়ার সময়। সামান্য তারতম্য হলেই মা-ইলিশ ডিম নষ্ট করে ফেলে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে নদীতে দখল-দূষণ, ডুবোচর ও অবকাঠামো নির্মাণ বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইলিশের বিচরণসহ সার্বিক জীবনচক্রে ব্যাঘাত ঘটছে। হুমকিতে পড়েছে এর প্রজনন।
মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে দেশে মোট ইলিশ উৎপাদন হয়েছিল ২ লাখ ৯৮ হাজার টন। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তা বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ, অর্থাৎ ৫ লাখ ১৭ হাজার টনে উন্নীত হয়। কিন্তু এর পর থেকেই ইলিশ আহরণ নানা কারণে শ্লথ হয়ে আসে। গত অর্থবছর তো উৎপাদন না বেড়ে উল্টো কমেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে ৫ লাখ ৭১ হাজার টন ইলিশ ধরা পড়লেও গত অর্থবছর তা কমে ৫ লাখ ২৯ হাজার টনে দাঁড়ায়। সে হিসাবে জনপ্রিয় মাছটির আহরণ কমেছে ৪২ হাজার টন।
ইলিশ আহরণ কমার পেছনে নদ-নদীর দূষণকে বড় কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর দূষণ শীতলক্ষ্যা হয়ে মেঘনায় যাচ্ছে, আর মেঘনা ইলিশ মাছের অন্যতম চলাচলের জায়গা। কিন্তু দিন দিন দূষণ বৃদ্ধির ফলে এখানে মাছের চলাচল কমে এসেছে। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. নিয়ামুল নাসের বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দূষণের কারণে পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা কমে গেলে যেকোনো মাছ তার আবাস বদলায়। একইভাবে ইলিশ যখন দেখে পদ্মা বা মেঘনায় দূষণ, তখন সে ওই এলাকায় আর ডিম পাড়তে আসে না।’
বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশ ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবেও স্বীকৃতি পেয়েছে। ওয়ার্ল্ড ফিশের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিশ্বের মোট ইলিশের ৮৬ শতাংশই উৎপাদন হয় এ দেশে।
দেশে রয়েছে এর চারটি প্রজনন ক্ষেত্র ও ছয়টি অভয়াশ্রম। চট্টগ্রামের মিরসরাই থেকে শুরু করে ভোলার লালমোহন উপজেলা পর্যন্ত ইলিশের সবচেয়ে বড় প্রজনন ক্ষেত্র। এর মধ্যে মনপুরা, ঢালচর, বালিরচর, মৌলভীরচর ডিম ছাড়ার সবচেয়ে বড় পয়েন্ট। চট্টগ্রাম, ভোলা, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, চাঁদপুর, পটুয়াখালী, বরগুনা মিলিয়ে প্রায় সাত হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় ইলিশ সবচেয়ে বেশি ডিম ছাড়ে।
এর বাইরে উপকূলের অন্যান্য নদীতেও ডিম ছাড়ে বলে জানান মৎস্য গবেষকরা। আর ইলিশের অভয়াশ্রমগুলো মূলত মেঘনা নদী ও তার অববাহিকা এবং পদ্মা ও মেঘনার সংযোগস্থলে অবস্থিত। এর মধ্যে চাঁদপুরে মেঘনার নিম্ন অববাহিকার ১০০ কিলোমিটার, ভোলায় শাহবাজপুর শাখা নদীর ৯০ কিলোমিটার ও তেঁতুলিয়া নদীর প্রায় ১০০ কিলোমিটার এলাকা অন্যতম। এছাড়া পদ্মার ২০ কিলোমিটার এলাকা, বরিশালের হিজলা, মেহেন্দীগঞ্জে মেঘনার প্রায় ৮২ কিলোমিটার এলাকাকেও ইলিশের অভয়াশ্রম হিসেবে ধরা হয়।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বঙ্গোপসাগর থেকে ইলিশ প্রবেশের মূল পথ মেঘনার বিভিন্ন স্থানে পলি জমে ডেগার চর ও ডুবোচর সৃষ্টি হয়ে আছে। ফলে মা-ইলিশ ডিম ছাড়ার জন্য মিঠা পানিতে প্রবেশে বাধা পেয়ে আবার সাগরেই ফিরে যাচ্ছে। আবার মেঘনায় ফোটা ইলিশের পোনাও বড় হওয়ার জন্য সমুদ্রে যেতে পারছে না। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় আবার বর্ষায়ও বৃষ্টি কম হতে দেখা যাচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে। তাতে মিঠা পানির স্তর কমে বেড়ে যাচ্ছে তাপমাত্রা। এর প্রভাব পড়ছে মেঘনায় আবদ্ধ ইলিশ ও জাটকার ওপর। এদিকে নির্দিষ্ট সময়ে মাছ ধরা নিষেধ থাকলেও অবাধে মা-ইলিশ ও জাটকা নিধন করে চলেন অসাধু জেলেরা। এ কারণেও দিন দিন মেঘনা থেকে সুস্বাদু ইলিশ হারিয়ে যাচ্ছে।
বরিশালের হিজলা উপজেলার বাসিন্দা ও মেঘনা নদীর জেলে সোলায়মান বেপারী জানান, সাগরে কিছু ইলিশ ধরা পড়লেও নদীতে একেবারেই মিলছে না। দুই-তিন বছর আগে যে ইলিশ ধরা পড়ত, তা এখন অর্ধেকে নেমে গেছে। সাগর মোহনায় ডুবোচর ও বিভিন্ন জালের মাধ্যমে মৎস্য শিকারের কারণেও নদীতে ইলিশ ভিড়তে পারছে না।
বরিশালের হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলম বলেন, ‘সাগর মোহনায় ডুবোচরের কারণে নদী নাব্য হারাচ্ছে। এতে জোয়ারের স্রোতের তীব্রতা কমে যাওয়ায় ইলিশ প্রবেশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাই তুলনামূলকভাবে নদ-নদীতে ইলিশ কমছে। সাগরের এসব মোহনায় ডুবোচর খনন করে নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনতে পারলে ইলিশ প্রবেশ এবং প্রজননে বাধা থাকবে না।’
মৎস্য গবেষকরা জানান, ইলিশের ধর্মই হচ্ছে সোজা পথে চলা। ডুবোচরে বাধা পেলে ওরা বিকল্প পথ না খুঁজে ফিরে যায় সাগরে। এ বিষয়ে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মুহাম্মদ আবু বকর সিদ্দিক বলেন, ‘সাগর মোহনায় পলি পড়ার কারণে দেশের নদ-নদীতে ইলিশের প্রাপ্যতা কমে যাচ্ছে।
পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের একটি বিরাট প্রভাব রয়েছে। ইলিশের জন্য যে তাপমাত্রা দরকার সেটা না পাওয়ার কারণেও গভীর সমুদ্রে ইলিশ চলে যাচ্ছে। আর আমাদের দেশের ফিশিং বোটগুলোয় সে ধরনের যন্ত্রপাতি নেই যে গভীর সমুদ্র থেকে মাছ আহরণ করবে। তাই সাগর মোহনায় যে ডুবোচর তৈরি হচ্ছে তা অপসারণ দরকার।’
নদীতে মাছ বিচরণের ক্ষেত্রে দূষণ সরাসরি প্রভাব ফেলে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। প্রথমত, পানিতে নির্দিষ্ট পরিমাণ পিএইচ লেভেল প্রয়োজন। পিএইচের মাত্রা সাতের নিচে নামলে পানির মান খারাপ হতে থাকে। ওই পানিতে মাছের বসবাসের উপযোগিতা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। একইভাবে পানিতে যদি দ্রবণীয় অক্সিজেনর মাত্রা কম থাকে সেখানেও মাছ বসবাস করতে পারে না।
বাংলাদেশের নদীতে যে ধরনের দূষণ দেখা যায়, তাতে ইলিশের মতো সামুদ্রিক মাছের জন্য টিকে থাকা কঠিন বলে জানান নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো. মহিনুজ্জামান।
তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে জাহাজ ভাঙা শিল্পের কারণে নদীতে ভারী ধাতুর পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে।
একইভাবে জাহাজের তেল, বর্জ্যসহ বিভিন্নভাবে নদী দূষিত হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, ইলিশ মাছ বিচরণের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ জায়গা প্রয়োজন হয়। নদীতে বাঁধ, অবকাঠামো নির্মাণের কারণে সে জায়গাগুলো সরু হয়ে এসেছে। কোথাও কোথাও চর জেগেছে। এসব কারণে মিঠা পানিতে ইলিশের প্রজনন যেমন কমেছে, কমেছে ইলিশ আহরণও। নদী দূষণ ও ইলিশ আহরণসহ মাছের আবাস নিয়ে যেভাবে ভাবা দরকার আমরা সেভাবে ভাবছি না।’
চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালীর হাতিয়া হয়ে মেঘনা নদী গিয়ে পড়েছে বঙ্গোপসগরে। এর মধ্যে লক্ষ্মীপুরের চারটি উপজেলার ৩৭ কিলোমিটার মেঘনার মোহনা, যাকে ইলিশ প্রজনন ও উৎপাদনের মূল কেন্দ্র ধরা হয়। এখানকার ইলিশের ব্যাপক চাহিদা, যা ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। তবে কয়েক বছর ধরে ভরা মৌসুমেও মেঘনায় কাঙ্ক্ষিত ইলিশ মিলছে না। জেলেদের জালে যেসব ইলিশ ধরা পড়ে তার ৭০-৮০ শতাংশই সামুদ্রিক।
ইলিশ গবেষক ও বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (নদী কেন্দ্র) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আনিছুর রহমান বলেন, ‘এখন চাঁদপুর অঞ্চলে ইলিশ কম পাওয়াটা স্বাভাবিক। কারণ বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা নদী দূষণ এবং পদ্মা-মেঘনায় চর ও ডুবোচরের কারণে কিছু সমস্যা হচ্ছে। আমরা শুধু নদী থেকে জাল দিয়ে ইলিশ ধরে খাচ্ছি। কিন্তু তাদের চলাচলের পথ সুগমের ব্যবস্থা নিচ্ছি না। আমরা কি ইলিশ চলাচলের পথ ঠিক রাখার জন্য ড্রেজিং করি? কোথাও যদি ফেরি আটকে যায় তাহলে সে অঞ্চলেই শুধু ড্রেজিং করা হয়।’
গবেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের যেসব নদীতে ইলিশ মাছ বিচরণ করে বিশেষ করে পদ্মা-মেঘনাসহ অন্যান্য নদীতীরে গড়ে উঠেছে শিল্প-কারখানা। এসব কারখানা থেকে অপরিশোধিত তরল বর্জ্য নদীতে ফেলা হয়। খালি চোখে এসব তরল বর্জ্যের কোনো ক্ষতিকারক দিক হয়তো ফুটে ওঠে না। কিন্তু পানির গুণগত মান বদলানোর কারণে প্রভাব পড়ে ইলিশসহ অন্যান্য মাছের প্রজননে।
বিষয়টি ব্যাখ্যা করে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, ‘পদ্মা-মেঘনার পাশাপাশি পশুর কিংবা বড় নদীগুলোয়ও এখন আর আগের মতো ইলিশ মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। শিল্প দূষণের কারণে পানির গুণগত মান বদলে যায়। এর ফলে কোথাও কোথাও ইলিশ আসা বন্ধ করে দিয়েছে। আবার এলেও ডিম না পেড়েই চলে যায়। কোথাও যদি ডিম পাড়েও সেটা ফুটে মাছ হবে সে গুণাগুণ তাতে থাকে না। কখনো কখনো ডিম নষ্ট হয়ে যায়। আবার কখনো মাছের লিঙ্গ ঘনত্বও বদলে যায়। সাধারণত একটি পুং ও স্ত্রী মাছ জন্মানোর নিয়ম। সেখানে দেখা গেছে এ নিয়ম খাটে না। এগুলো সবই দূষণের সঙ্গে সম্পৃক্ত। নদ-নদীর দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ভবিষ্যতে মিঠা পানিতে ইলিশ পাওয়ার সম্ভাবনা আরো কমতে থাকবে।’
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার পরিবেশের ওপর গুরুত্বারোপ করে সম্প্রতি বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে লবণাক্ততার প্রভাব আছে। সেই সঙ্গে বৃষ্টি হওয়া না-হওয়ার সঙ্গে ইলিশের ডিম ছাড়ার একটা সম্পর্ক আছে। কাজেই জলবায়ু পরিবর্তনে আমরা কী করতে পারি তা গবেষকরা দেখতে পারেন। ইলিশের ব্যবস্থাপনা ঠিকমতো করতে পারলে বিশ্বের কাছে তা পরিচয় করিয়ে দেয়া সম্ভব। তাই ইলিশকে আন্তর্জাতিকভাবে তুলে ধরতে হবে।’

Posted ২:০৩ অপরাহ্ণ | শুক্রবার, ১৫ আগস্ট ২০২৫
coxbangla.com | Chanchal Das Gupta